আমাদের নিউজ পোর্টাল ভিজিট করুন ...

৮ বছরেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি মনোহরগঞ্জে

বিশেষ প্রতিবেদন: উপজেলা হওয়ার বছরেও ডিজিটালের ছোঁয়া লাগেনি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলায় নিজস্ব অবকাঠামোতে দাঁড়াতে পারেনি নবগঠিত উপজেলাটি প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে আবাসিক ভবনে


গত ২৬ আগস্ট ছিল মনোহরগঞ্জ উপজেলার অষ্টম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ২০০৪ সালে এই দিনে দক্ষিণ কুমিল্লার জলাঞ্চলখ্যাত মনোহরগঞ্জ উপজেলার আত্মপ্রকাশ ঘটে। নিকার ৯১তম সভায় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাবেক লাকসাম উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চের ১১টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে দেশের ২৭২তম এবং কুমিল্লার ১৫তম এই উপজেলার নীতিগত অনুমোদন দেন।

একই বছরে ৩০ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশিক হওয়ার পর প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি।

ভৌগোলিক দিক থেকে কুমিল্লার সর্ব দক্ষিণে চাঁদপুর এবং নোয়াখালী জেলার সীমান্তবর্তী অজপাড়াগাঁয়ে অবস্থিত মনোহরগঞ্জ উপজেলা। উপজেলা স্থাপনের পর থেকে ৮টি বছর পেরিয়ে গেলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি অঞ্চলে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এখানকার জনসাধারণ।

দীর্ঘ দিনেও উপজেলার পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। নিজস্ব ভবনের অভাবে দাফতরিক কার্যক্রম প্রথমে একটি স্থানীয় কলেজের দ্বিতীয় তলায়, ভাড়া বাসায় বর্তমানে উপজেলার প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের আবাসিক ভবনে চলছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, পশুসম্পদ, উপজেলা প্রকৌশলীসহ অন্যান্য কর্মকর্তার দাফতরিক কর্যাক্রম।

উপজেলার প্রশাসনিক ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও উদ্বোধন না হওয়ায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। উপজেলা, সাবরেজিস্টার, পরিসংখ্যান, খাদ্য অফিস, খাদ্য গোডাউন, জেনারেল পোস্ট অফিস, ট্রেজারিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ অফিস এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন হয়নি আজও।

আর যেসব অফিস কর্মচারী-কর্মকর্তাদের পদায়ন হয়েছে তারা পোহাচ্ছেন অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। মনোহরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের শাখা থাকলেও ট্রেজারি কার্যক্রম না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একরকম বাধ্য হয়ে তাদের বেতন-ভাতাসহ ট্রেজারি সংকান্ত যাবতীয় লেনদেনের জন্য ছুটে যান ১২ কি.মি. দূরে লাকসাম উপজেলার হিসাবরক্ষণ অফিসে সোনালী ব্যাংক লাকসাম শাখায়।

তাছাড়া কিছু অফিস রয়েছে যেগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লাকসাম উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন।

খাদ্য অফিস গোডাউন না থাকায় এতদসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে লাকসাম উপজেলা থেকে। সরকারের দরিদ্রদের ভিজিএফ, ভিজিডি এবং কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির মালামাল বিতরণ মনিটরিং করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে লাকসাম উপজেলায় যেতে হয়। এতে সময় আর্থিক ব্যয়সহ কার্যক্রম পরিচালনা ব্যাহত হচ্ছে।

অন্যদিকে উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে রয়েছে অসংখ্য সমস্যা। ভবনের অভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কাজ চলছে মইশাতুয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে। স্যাটেলাইট ক্লিনিকগুলো নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্বের প্রতি চরম অবহেলা এবং নানা ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।

তাছাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের কার্যক্রম চলছে জেলা পরিষদ ডাকবাংলা ভবনে। উপজেলা ভূমি অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত এসিল্যান্ডের বিভিন্ন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে

বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের খপ্পরে পড়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে নিরীহ মানুষ। গ্যাস, টেলিফোন লাইন, আবাসিক ভবন ব্যবস্থা না থাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাধ্য হয়ে সুদূর কুমিল্লা বা লাকসাম থেকে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে আর্থিক ব্যয়ও বাড়ছে।

মনোহরগঞ্জে ফায়ার সার্ভিস না থাকায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আগুনে পুড়ে বছরে বহু টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে

ব্যাপারে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংস্থাপন সচিবকে কয়েক দফা লিখিতভাবে জানানো হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী অফিসার। এসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহেদুর রহমান আমাদের লাকসামকে বলেন, একটি নতুন উপজেলাকে পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামোতে দাঁড় করাতে বছর সময়ই যথেষ্ট নয়, তথাপি সমস্যাগুলো সমাধানে আমাদের অনেক পদক্ষেপ রয়েছে।

নির্বাহী অফিসার বলেন, সর্বশেষ এমপির উপস্থিতিতে উপজেলা মাসিক উন্নয়ন সমন্বয় সভায় সমস্যাগুলো নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা হয়। তিনি অতি স্বল্প সময়ের মধ্যে সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের আশ্বাস দেন। অপরদিকে, উপজেলা সদর থেকে থানা কমপ্লেক্সটি প্রায় দেড় কি.মি. পশ্চিমে গ্রামের ভেতরে খালের পাড়ে অবস্থিত। সদরের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তার অধিকাংশ কাঁচা। বিভিন্ন এলাকা থেকে থানা সদরের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সেই মান্ধাতা আমলের লক্কড়ঝক্কড় বেবিট্যাক্সি। যেখানে বাস বা উন্নত যানবাহনের কোনো ব্যবস্থা নেই।

এলাকার রাস্তা মানে অসংখ্য খানাখন্দকে ভরা মেঠোপথ। যাত্রীসাধারণের ভোগান্তি এবং মূল্যবান সময় অপচয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এতে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলের তথা নাথেরপেটুয়া, বিপুলাসার, উত্তর হাওলা, লক্ষ্মণপুর, সরসপুর, জনতা বাজার, একতা বাজার, বাইশগাঁও হাসনাবাদ ইউনিয়নের লোকজন

রাস্তা-ঘাটের সংস্কার দাবিতে গত ২৩ আগস্ট থেকে লাকসাম-মনোহরগঞ্জ সড়কের যানবাহন অনির্দিষ্ট কালের জন্য ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। পরে মনোহরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সংসদ সদস্যের সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো পুনর্মেরামত করার আশ্বাস দিলে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।

উল্লেখ্য, নাথেরপেটুয়া থেকে থানা সদরের দূরত্ব মাত্র কিলোমিটার হলেও সেখান থেকে সদরে পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় ঘণ্টা। অথচ ওই স্থান থেকে রাজধানী ঢাকা পৌঁছতে লাগে মাত্র ঘণ্টা। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা যানবাহনের বেহাল অবস্থা।

আর ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে নাথেরপেটুয়া-লক্ষ্মণপুর, কাশিপুর-মনোহরগঞ্জ, বাইশগাঁও-মান্দারগাঁও, মনোহরগঞ্জ-হাসনাবাদ. চিতোশি- পোমগাঁও-মনোহরগঞ্জ, খিলা-মনোহরগঞ্জ সড়কগুলো সংস্কার এবং সড়কগুলোতে বাস টেম্পুসহ আধুনিক যানবাহন চলাচল উপযোগী করে তোলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ভুক্তভোগী এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেছে