আমাদের নিউজ পোর্টাল ভিজিট করুন ...

৬৮টি বয়লার মুরগীর খামার বন্ধ : নাঙ্গলকোটে পোল্ট্রি শিল্পের দূর্দিন কাটছেই না

স্পেশাল করেসপন্ডেন্টঃ  নাঙ্গলকোটে পোল্ট্রি শিল্পের চরম দুর্দিন চলছে বয়লার মুরগীর ফিড, ভ্যাকসিন, ভিটামিন, এ্যান্টিবায়োটিক, ক্যালসিয়াম সহ অন্যান্য ঔষধের অব্যাহত দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পোল্ট্রি শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে গত ২মাসের ব্যবধানে ৬৮টি বয়লার মুরগীর খামার বন্ধ হয়ে গেছে বলে উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়। পোল্ট্রি খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিল্পের সাথে জড়িত ব্যাক্তিদের চরম আর্থিক দৈন্যতায় কাটাতে হচ্ছে। বয়লার মুরগীর পোল্ট্রি খামারীরা লাখ-লাখ টাকা পুঁজি দিয়ে শেড নির্মাণ করে ব্যবসা শুরু করেন। কিন্তু খরচের তুলনায় বাজারে বয়লার মুরগীর চাহিদা এবং দাম কম হওয়ায় অব্যাহতভাবে লোকসান দিয়ে তাদেরকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কোনভাবে সম্ভব হচ্ছেনা বলে অনেক খামারী জানান।
যার ফলে অনেক খামারী তাদের পোল্ট্রি খামার ব্যবসা গুটিয়ে নিতে একরকম বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া, ব্যাংক, এনজিও ঋণ এবং পোল্ট্রি ফিড ব্যবসায়ীদের পাওনা টাকা পরিশোধ করতে না পারায় অনেক খামারী পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বিভিন্ন পোল্ট্রি খামারে গিয়ে দেখা যায়, লাখ-লাখ টাকা খরচ করে খামারের জন্য তৈরী করা শেডগুলো শূণ্য পড়ে আছে। বর্তমানে শিল্পের সাথে জড়িত মালিক, ফিড ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকরা বেকার হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন


এদিকে, প্রাণী সম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, অতীতে নিবন্ধন এবং নবায়ন ফি ছাড়া খামার রেজিষ্ট্রেশনভুক্ত করা হলেও সম্প্রতি প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে খামার নিবন্ধন নবায়নের ফি ধার্য করায় খামারীদের নিকট নিবন্ধন নবায়ন ফিমরার উপর খড়ার ঘাহিসেবে দেখা দিয়েছে। ৫বছরের জন্য লেয়ার মুরগীর খামারের নিবন্ধন ফি ধার্য করা হয়েছে হাজার টাকা, নবায়ন ফি ধার্য করা হয়েছে হাজার ৫শ টাকা। বয়লার মুরগীর খামারের নিবন্ধন ফি ধার্য করা হয়েছে ২হাজার ৫শ টাকা এবং নবায়ন ফি ধার্য করা হয়েছে হাজার টাকা

জানা যায়, বয়লার মুরগীর বিভিন্ন কোম্পানীর পোল্ট্রি ফিডের দাম ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা ২হাজার ১শ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২হাজার ৩শ ৩০টাকা  হয়েছে। আবার কোন কোম্পানীর ফিড ২হাজার ৪শ ৩০টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। বয়লার মুরগীর প্রতিটি বাচ্চা ২৫টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৫৫টাকায় ক্রয় করতে হচ্ছে। ফিড ব্যবসায়ীরা ভুট্টার, খৈল, তৈলের দাম বৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে প্রতিনিয়ত খাদ্যের দাম বৃদ্ধি করছেন। ঔষধ কোম্পানী নোভারটিস, স্কয়ার, রেনেটা, অপসোনিন, এফ. এন. এফ, প্লাটিনা, নিউটেক সহ বিভিন্ন কোম্পানীর ঔষধের দাম প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাণীক্ষেত রোগের ভ্যাকসিন গত ২মাসের ব্যবধানে ২শ ৫০টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫শ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। গামব্রোরো রোগের ভ্যাকসিন ৬শ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১হাজার টাকা হয়েছে। এছাড়া, অন্যান্য এ্যান্টিবায়োটিক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি সহ বিভিন্ন ঔষধের দাম ৪০টাকা থেকে ১শ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। খামারীরা প্রতি কেজি বয়লার মুরগী পাইকারী হারে ১শ ২৫ টাকা থেকে ১শ ৩০টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন। কিন্তু খুচরা বিক্রেতারা ১শ ৫০টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছেন

নাঙ্গলকোট প্রাণী সম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, অব্যাহত লোকসানের মুখে গত দুমাস থেকে পৌর সভা সদরের মডার্ণ পোল্ট্রি ফার্ম, মান্দ্রার খোদেজা পোল্ট্রি ফার্ম, অনিক পোল্ট্রি ফার্ম, অশ্বদিয়ার তাসফিয়া পোল্ট্রি ফার্ম, হরিপুরের বি ফোল্ট্রি ফার্ম, মক্রবপুরের মনির পোল্ট্রি ফার্ম, বাঙ্গড্ডা ইউপির বাঙ্গড্ডা গ্রামের জাফ পোল্ট্রি ফার্ম, নশরতপুরের মা পোল্ট্রি ফার্ম, পরিকোটের রেজু পোল্ট্রি ফার্ম, কাদবার মিতালী পোল্ট্রি ফার্ম, রৌশন পোল্ট্রি ফার্ম, আমির পোল্ট্রি ফার্ম, শ্যামপুরের কে পোল্ট্রি ফার্ম, বেরীর মহসীন পোল্ট্রি ফার্ম, আহসান পোল্ট্রি ফার্ম, পেড়িয়া ইউপির দৌলতপুরের মোহাম্মদ পোল্ট্রি ফার্ম, শাকতলীর গোফরান পোল্ট্রি ফার্ম, মোজাম্মেল পোল্ট্রি ফার্ম, গ্লোবাল পোল্ট্রি ফার্ম, মজুমদার পোল্ট্রি ফার্ম, রুদ্রছুমার সোহেল পোল্ট্রি ফার্ম, জোড়পুকুরিয়ার মা পোল্ট্রি ফার্ম, বড়স্বাঙ্গিশ্বরের খোরশেদ পোল্ট্রি ফার্ম, স্বপন পোল্ট্রি ফার্ম, রহমান পোল্ট্রি ফার্ম, রুবেল পোল্ট্রি ফার্ম, পেড়িয়া গ্রামের শরীফ পোল্ট্রি ফার্ম, সায়মুন পোল্ট্রি ফার্ম, রায়কোট ইউপির মটুয়া গ্রামের খোরশেদ পোল্ট্রি ফার্ম, রায়কোট নদীর পাড় বাহার পোল্ট্রি ফার্ম, বেল্লাল পোল্ট্রি ফার্ম, হাছান পোল্ট্রি ফার্ম, চাঁন মিয়া পোল্ট্রি ফার্ম, রিপন পোল্ট্রি ফার্ম, বশির পোল্ট্রি ফার্ম, রেজু পোল্ট্রি ফার্ম, যজ্ঞশাল গ্রামের মন্নান পোল্ট্রি ফার্ম, তুলাতুলির বেল্লাল পোল্ট্রি ফার্ম, মাহিনীর দেলু পোল্ট্রি ফার্ম, আরমান পোল্ট্রি ফার্ম, ইমাম পোল্ট্রি ফার্ম, হানিফ পোল্ট্রি ফার্ম, কাজী পোল্ট্রি ফার্ম, বেকামলিয়ার আলমগীর পোল্ট্রি ফার্ম, ঝাটিয়াপাড়ার মোশারফ পোল্ট্রি ফার্ম, লক্ষীপদুয়ার চেরু পোল্ট্রি ফার্ম, মাইন উদ্দিন পোল্ট্রি ফার্ম, শরীফপুরের হাসান পোল্ট্রি ফার্ম (), (),ছুপুয়ার মোহাম্মদ পোল্ট্রি ফার্ম, বক্সগঞ্জ ইউপির শুভপুরের নুরুল হুদা পোল্ট্রি ফার্ম, অষ্ট্রগ্রামের নুরু পোল্ট্রি ফার্ম, মদনপুরের মক্কা পোল্ট্রি ফার্ম, জোড্ডা ইউপির নারায়নকোটের মাওঃ আবদুল হাই পোল্ট্রি ফার্ম, হেসাখালের হৃদয় পোল্ট্রি ফার্ম, রহিম পোল্ট্রি ফার্ম, বোরহান পোল্ট্রি ফার্ম, দৌলখাঁড়ের আশিক পোল্ট্রি ফার্ম, সোনালী পোল্ট্রি ফার্ম, ঢালুয়া ইউপির বদরপুরের রফিক পোল্ট্রি ফার্ম, কাদের পোল্ট্রি ফার্ম, শুভপুরের আইয়ুব পোল্ট্রি ফার্ম, গিয়াস পোল্ট্রি ফার্ম, তেলপাই গ্রামের সাইফুল পোল্ট্রি ফার্ম, মৌকরা ইউপির আলীয়ারার হাকিম পোল্ট্রি ফার্ম, ফতেহপুরের রুহুল আমিন পোল্ট্রি ফার্ম, ময়ুরার জয়নাল পোল্ট্রি ফার্ম, মোড্ডার মাসুদ পোল্ট্রি ফার্ম বন্ধ রয়েছে

মডার্ণ পোল্ট্রি খামারের মালিক খলিলুর রহমান সোহাগ জানান, বর্তমানে পোল্ট্রি খামারীদের চরম দুর্দিন চলছে। পোল্ট্রি ফিড, বাচ্চা, ভ্যাকসিন সহ বিভিন্ন ঔষধের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় আমার খামারের হাজার মুরগীর শেডের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১হাজার মুরগীর শেড চালু রেখেছি। পৌরসভার মানরা গ্রামের ভ্যান চালক হাছান জানান, আমার খামারে ২হাজার মুরগী নিয়ে শেড চালু করি। কিন্তু অব্যাহত লোকসান হওয়ায় বর্তমানে মুরগী উঠানো বন্ধ রেখেছি। এভাবে উল্লেখিত খামারীরা গত ২মাস থেকে তাদের খামারে মুরগীর উঠানো বন্ধ রেখেছেন

জানা যায়, কক্সবাজারের সাতকানিয়ার আবদুল হাকিম মৌকারা ইউপির আলিয়ারা গ্রামে গত ৩বছর থেকে ভাড়া ভিত্তিক ৮হাজার মুরগীর খামার পরিচালনা করে আসছিলেন। গত প্রায় ১মাস পূর্বে আবদুল হাকিম লোকসানের মুখে পোল্ট্রি খামার বন্ধ করে শেডের মালিক, বিভিন্ন ফিস ফিড ব্যবসায়ীদের খাদ্য এবং কীটনাশকের মূল্য বাবাদ প্রায় ১৭লাখ টাকা বকেয়া রেখে পালিয়ে যায়। শেড মালিক এবং ব্যবসায়ীরা পুঁজি হারিয়ে তাকে হন্য হয়ে খুঁজছেন। এছাড়া, পেড়িয়া ইউপির দৌলতপুর গ্রামের মোহাম্মদ লোকসানের মুখে ৪হাজার মুরগির খামার বন্ধ করে, ফিড ব্যবসায়ীদের ৫লাখ টাকা বকেয়া রেখে পালিয়ে যায়
নাঙ্গলকোট উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মুহাম্মদ আলমগীর কবির জানান, নাঙ্গলকোটে বর্তমানে ৬৮টি খামার বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের কর্মীরা জরিপ কাজ করছেন। এনিয়ে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। মুরগীর খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে আমাদের কোন হাত থাকে না। আমাদের নিকট স্বল্প মূল্যের রাণী ক্ষেত এবং গামব্রোরো রোগের পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন রয়েছে। কিন্তু খামারীরা আমাদের নিকট আসেনা। তারা ফিড ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের নিকট জিম্মি হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সেখান থেকে তাদেরকে মুক্ত করতে পারলে খামারীরা লাভবান হবে বলে আমি মনে করি। খামারীরা আমাদের নিকট আসলে আমরা তাদেরকে টেকনিক্যাল সহযোগিতা সহ সব ধরণের সহযোগিতা করবো। তিনি আরো জানান, প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে খামারীদের স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা থাকলে আমরা তাদেরকে আরো বেশি সহযোগিতা করতে পারতাম