আমাদের নিউজ পোর্টাল ভিজিট করুন ...

অর্থ সঙ্কটে লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের নির্মাণ কাজ বন্ধ!

বিশেষ প্রতিবেদন: দুইশ বছর আগে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথ এখন মারাত্বক ঝুঁকিপূর্ণ ৫২ কিলোমিটার দৈর্ঘোর এই শাখা রেল লাইনটি নির্মাণের পর আর পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের মুখ দেখেনি বিভিন্ন সময়ে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করতে নামকাওয়াস্তে কিছু সংস্কার কাজ করা হলেও ঝুঁকিমুক্ত হয়নি রেললাইনটি

গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুরগামী একটি তেলবাহী ট্যাংকার স্পেশাল ট্রেন লাকসামের চিতোষী রেল ষ্টেশন সংলগ্ন স্থানে লাইচ্যুত হয়। সময় ওই ট্রেনের পেছনের ৪টি তেলবাহী ট্যাংকার রেললাইনের পাশে উপড়ে পড়ে। তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুতির দীর্ঘ ২৭ ঘন্টা পর লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথে রেল যোগাযোগ শুরু হয়ে

বাংলাদেশের বিভিন্ন শাখা রেললাইনের আমূল পরিবর্তন হলেও অবহেলিত থেকে গেছে লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথ। পুরনো রেললাইনগুলো ক্ষয়ে গেছে, রেললাইন থেকে সরে গেছে মাটি, ¯ি¬পারগুলো ভাঙ্গা, রেললাইনের পুরো অংশই প্রায় পাথরবিহীন, স্টেশনগুলো জরাজীর্ণ ব্যবহার অনুপযোগী।

সব সরকারের আমলেই নেক নজরে আসতে ব্যর্থ হয় লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথ। বিগত জোট সরকারের আমলে প্রায় দুইশ কোটি টাকা ব্যয়ে এই শাখা রেলপথ উন্নয়নের প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও রাজনৈতিক তদবির আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পটি বাতিল করে লাকসাম-নোয়াখালী রেললাইনের সংস্কার করা হয়।

এরপর বর্তমান সরকারের আমলে ১৬৮ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে লাকসাম-চাঁদপুর রেললাইন রি-মডেলিং প্রকল্প অনুমোদন হলেও প্রায় এক বছর পর্যন্ত তা লাল ফিতায় বন্দি। দীর্ঘদিনেও এই প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি। অর্থ ছাড় না হওয়ায় প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না বলে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক আমাদের লাকসামকে জানান। তিনি আশা করেন নতুন অর্থ বছরে বরাদ্দকৃত অর্থ ছাড় করা হলে প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাবে।

লাকসাম চাঁদপুরবাসীর প্রাণের দাবি লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। লাকসাম থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত স্টেশন রয়েছে ১১টি। এর মধ্যে বি ক্লাস স্টেশন পাঁচটি। বাকি ছয়টি ডি ক্লাসে। সবগুলো স্টেশনের অবস্থাই নাজুক।

লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথকে সরকার বহু আগেই ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ না করায় রেলপথে ট্রেন চলাচলে দিনদিনই অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

পর্যাপ্ত পাথর স্লিপারবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ রেললাইন দিয়েই প্রতিদিন হাজারো যাত্রীর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্তঃনগর মেঘনা সাগরিকা এক্সপ্রেসসহ সাতটি ট্রেন চলাচল করে। অথচ দেশের শাখা রেলপথগুলোর মধ্যে লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের গুরুত্ব বাণিজ্যিকভাবে প্রথম স্থানে। কারণ, নদীবন্দর চাঁদপুর থেকে প্রতিদিন রূপালী ইলিশসহ বিভিন্ন মৎস্য পণ্য রপ্তানীর পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো যাত্রী চট্টগ্রাম সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে।

ঝুঁকিপূর্ণ লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের সংস্কার না করায় এবং যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি না হওয়ায় ঐতিহবাহী রেলপথের গুরুত্ব হারিয়ে যেতে বসেছে। লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথের গুরুত্ব ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার একাধিক কারণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত রেলপথের শতভাগ সংস্কার না হওয়া। এছাড়াও চলাচলকারী ট্রেনে রয়েছে কোচ স্বল্পতা, স্থানীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনিয়ম দুর্নীতি বাস ট্রাক মালিকদের স্বার্থ রক্ষায় রেলওয়ের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করেছে।

লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথে প্রতিদিন ১০-১২টি ট্রেন চলাচল করলেও বর্তমানে আন্তঃনগর মেঘনা সাগরিকা এক্সপ্রেস ছাড়া পাঁচটি ট্রেন চলাচল করে। পাঁচটি লোকাল ট্রেনের জন্যে কাগজে-কলমে ৩৮টি কোচ বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে রয়েছে মাত্র ১০টি। ফলে ১০টি কোচ দিয়েই পাঁচটি ট্রেন চলাচল করে। এক্ষেত্রে কোচ স্বল্পতায় যাত্রিদের প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

পর্যাপ্ত পাথর স্লিপারবিহীন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথে ২০০৮ সালের আট বার লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণহানি না হলেও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। ফলে আন্তঃনগর মেঘনা এক্সপ্রেসের গতিবেগ ঘন্টায় ৬০ কিলোমিটারের পরিবর্তে রেলপথের লাকসাম থেকে হাজীগঞ্জ পর্যন্ত ঘন্টায় ৪০ কিলোমিটার এবং হাজীগঞ্জ থেকে চাঁদপুর ঘন্টায় ২৫ কিলোমিটার গতিতে চালাতে হয়। কারণে চাঁদপুর থেকে লাকসাম যেতে যেখানে সময় লাগতো সোয়া এক ঘন্টা, সেখানে বর্তমানে আড়াই থেকে তিন ঘন্টায় যেতে হয়!