আমাদের নিউজ পোর্টাল ভিজিট করুন ...

নাঙ্গলকোটে স্বপ্নে পাওয়া মাটি খেতে মানুষের ঢল

জয়নাল আবদিন: [বৃহস্পতিবার, ২২ মার্চ ০১২] নাঙ্গলকোটের নূরপুরে স্বপ্নে পাওয়া মাটি খাওয়ার জন্য গত মাস ধরে এক মহিলা কবিরাজের কাছে হাজার হাজার নারী পুরুষ আসা যাওয়া করছে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের  চাপে বন্ধ হবার উপক্রম হচ্ছে দুটি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।..

ওষুধের বিনিময়ে কবিরাজের কোন চাহিদা না থাকলেও রোগীরা ইচ্ছামত মসজিদের জন্য দান করে নির্দিষ্ট টেবিলে। পর্যন্ত মসজিদের জন্য প্রায় কোটি টাকার উপরে উঠলেও এক তৃতীয়াংশও মসজিদের জন্য খরচ করা হয়নি বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন

তবে অভিযোগের ব্যাপারে  টাকা উত্তোলনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মহিলা কবিরাজের শ্বশুর আবদুস সোবহান মাস্টার জানান, আমরা কোন টাকা চাই না। খুশি হয়ে মসজিদের জন্য যে যা দান করে তা বিভিন্ন মসজিদে বন্টন করে দেই। ইতিমধ্যে টাকা দিয়ে -১০টি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছি

এদিকে সমস্ত রাত-দিন নারী পুরুষের ভিড় লেগে থাকায় এখানের সার্বিক পরিবেশও কিছুটা ভারি হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় মেম্বার|

সম্প্রতি নাঙ্গলকোট উপজেলার নং বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের নং ওয়ার্ডের নূরপুর গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নূরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন রাস্তায় বাজারের  মত অসংখ্য ভাসমান দোকান গড়ে উঠেছে। দূর থেকে আগত যে কেউ দেখলেই মনে করবে এখানে কোন হাট বসেছে
একটু সামনে গিয়েই দেখা যায়, বাঁশ দিয়ে লাইন করে দেওয়া হয়েছে মহিলা পুরুষদের জন্য। আমরা যখন যাই তখন কবিরাজ নামাজ পড়ছে বলে গেউট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাইরে কয়েক শত মহিলা পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ রাস্তার উপর কেউ স্কুলের মাঠে  এলোমেলো ঘোরাফেরা করছে। কয়েকজনকে দেখা গেল দুধের বাচ্চা নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। সদর দক্ষিণের শুয়াগজিতে থেকে যাওয়া ৭৫ বছরের আবদুল মালেক নামের এক বৃদ্ধা বাতের সমস্যার কারণে আসছেন। সকাল ১০টার দিকে আসলেও বেলা ২টা পর্যন্ত সিরিয়াল না পাওয়ায় স্কুলের বারান্দায় বসে চিড়া-গুড় খেয়ে ফ্লোরেই শুয়ে পড়েছেন

চারদিকে দেয়াল ঘেরা একতলা বাড়ির ভিতর ভিড় ঠেলে প্রবেশ করতেই দেখা গেল টেবিল চেয়ার নিয়ে বসা কয়েকজন বয়স্ক লোক। টেবিলের উপর রয়েছে মসজিদের নামে রোগীদের দানের টাকা। , , ১০, ২০ টাকাসহ নানা অংকের নোট রয়েছে সেখানে

কে এই মহিলা কবিরাজ: কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বেলঘর দক্ষিণ ইউনিয়নের মৃত আবদুল গণি রহিমা খাতুনের চার ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে কবিরাজ শাহিনুর বেগম চতুর্থ। মামাতো ভাই বর্তমান কুয়েত প্রবাসী মাওলানা আলমগীর হায়দার সবুজের সাথে এই নূরপুর গ্রামে তার বিয়ে হয়। বর্তমানে একাদশ চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ুয়া তার দুই মেয়ে রয়েছে

কবিরাজ হয়ে ওঠার গল্প: আজ থেকে চৌদ্দ বছর আগে একদিন রাতে স্বপ্ন দেখেন শাহিনুর বেগম। মাটি দিয়ে ওষুধ তেরি করে খাওয়ালে যে কোন অসুস্থ্ রোগী সুস্থ্ হয়ে যায়। কিন্ত তিনি তা আমলে নেননি বলে প্রতিবেদককে জানান। কয়েক বছর পর তার পেটে টিউমার হয় সাথে ক্যান্সার। কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টারে এসে চিকিৎসা করানো হয়। বিশাল এক টিউমার অপারেশন করা হলেও তিনি পুরাপুরি সুস্থ হয়ে উঠেননি। ২০১১ সালের আগষ্ট মাসের এক রাতে তিনি আবার স্বপ্ন দেখেন সেই ওষুধের। তার ভাষায় এবার তিনি এক নিয়তে খান এবং সুস্থ হয়ে যান। পরে আশেপাশের লোকজনকে বাদামের বিচির মত ছোট মাটির  কণার মতো ওষুধ  খাওয়াতে থাকেন। এতে লোকজন উপকার পেতে থাকেন বলে জানালেন তিনিসহ তার শ্বশুর। ভাবে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে তার রোগীর সংখ্যা। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে হাজার বিশের মত রোগী হয় বলে জানালেন মূল দায়িত্ব পালন করা শ্বশুর সোবহান মাষ্টার

এখন শুধু নাঙ্গলকোট নয় দেশের নানা জেলা থেকেই হাজার হাজার রোগী সপ্তাহে তিন দিন আসে তার কাছে। প্রথম প্রথম রোববারসোমবার মঙ্গলবার সকাল ৬টা-সাড়ে ৪টা পর্যন্ত রোগী দেখলেও বর্তমানে তিনি আর সময় নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। কারণ, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাত ১২টার পরই শুরু হয় রোগী আসা। তাই বাধ্য হয়েই কখনো কখনো রাত ৩টা থেকেই টানা রোগী দেখা শুরু করেন নামাজ খাবার বিরতি দিয়ে যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। এভাবে স্বপ্নপ্রাপ্ত এক মহিলা কবিরাজ হিসেবে নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ে তার গল্প

কবিরাজ কোন ধরণের রোগী দেখেন আর কি ওষুধ দেন: প্যারালাইসিস, ক্যান্সার, কষ্টি-কাঠিন্য, হাঁপানী, বাত, আমাশাসহ যে কোন জটিল কঠিন রোগের রোগী এবং নানা ধরণের সংসারিক সমস্যা, মানসিকসহ নানা ধরণের রোগী আসে তার কাছে

তবে তিনি কোন রোগীর বক্তব্য শুনেন না, সমস্যাও জানতে চান না। তার চিকিৎসার নিয়ম হলো যে যার মত করে শুধু মাত্র একটি নিয়ত করে লাইন ধরে তার সামনে যাবে আর তিনি হাতে থাকা ওই মাটির দানাটি মুখে দিয়ে দিবেন। এভাবে এখানে নিজে স্ব-শরীরে এসে রোগী দিন খেয়ে যাবেন। পরপর  তিন দিন না আসতে পারলেও সমস্যা নেই জানালেন কবিরাজ নিজেই

ওষুধের বিনিময়: কবিরাজ শাহিনুর বেগম ওষুধের বিনিময়ে কোন অর্থ টাকা নেননা। কথা জানিয়েছেন তিনি নিজে, এলাকাবাসী উপস্থিত কয়েকশরোগী। তবে মসজিদের জন্য দান গ্রহণ করা হয়। দানের পরিমান দায়িত্বরত সোবহান মাষ্টার বলতে না পারলেও স্থানীয় নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. মোতাহের হোসেন জানান, প্রতি দিন গড়ে প্রায় লক্ষ ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা উঠে

আগত লোকদের বক্তব্য: সোমবার দুপুরে লাইন দাঁড়িয়ে থাকা প্রায় অর্ধশত নারী-পুরুষের সাথে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাদের অধিকাংশই বলেন, আমাদের আশেপাশের আত্মীয়-স্বজনরা উপকার পেয়েছেন তাই আমরা এখানে আসছি। উপকার পেয়েছেন এমন কেউ আছেন জানতে চাইলে মাত্র - জন জানান, আমরা উপকার পেয়েছি। কিন্ত অবাক করার বিষয় হলো যে, সাধারণত বড় বড় হাসপাতালে যে সব রোগী নেয়া হয় এখানেও ঠিক তাই। প্যারালাইসে আক্রান্ত চান্দিনার এক বৃদ্ধ বলেন, বাবা শুনেছি এখানে এলে রোগ ভাল হয়। তাই এলাম দেখি আল্লাহ কি করেন

কবিরাজ শাহিনুর বেগমের বক্তব্য: আমরা কথা বলি কবিরাজ শাহিনুর বেগমের সাথে। পর্দাসীন এই মহিলা কথা বলেন আস্তে আস্তে মার্জিত ভাষায়।  তিনি প্রত্যয়ের সাথে জানালেন, আজীবন তিনি মানুষ সেবার এই কাজটি করে যাবেন। তবে এও বললেন, ইদানিং গ্রামের লোকেরা কিছুটা সমস্যা করতে চাচ্ছে

তিনি বলেন, রোগী দেখার কাজটি আমার আরো আগেই শুরু করার দরকার ছিল। দেরি করাতে আমার সন্তানদের কিছুটা সমস্যা হয়েছে আমি এটা বুঝতে পারছি। তার কবিরাজ হয়ে উঠার গল্প বলে ওষুধ তৈরির  কথা জানতে চাইলেই তিনি বলেন, এটা বলা যাবে না। বলা নিষেধ আছে

গ্রামবাসীদের অভিযোগ: নূরপুর গ্রামের লোকজন এই প্রতিবেদকের কাছে রোগী দেখা নিয়ে জানালেন তাদের অভিযোগের কথা

তারা বলেন, এখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হলি চাইল্ড একাডেমী নামে একটি কিন্ডারগার্টের স্কুল রয়েছে যা এখন বন্ধের উপক্রম হয়েছে। দুটি স্কুলে প্রায় ৫শছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করে। এখন মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ হাজার নারী-পুরুষের পদচারণায় এদের বয়ে নিয়ে আসা যানবাহনের আওয়াজে পুরো এলাকা কম্পিত

প্রসঙ্গে  নং বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের নং ওয়ার্ডের মেম্বার মো. মোতাহের হোসেন নাঙ্গলকোট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে এলাকাবাসীর পক্ষে একটি লিখিত আবেদন করেছেন, যাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রক্ষা সেবাখোলা থেকে যুক্তিরখোলা পর্যন্ত যানজট নিরসন করার  জন্য জরুরি ভিত্তিতে স্বপ্নে পাওয়া এই কবিরাজের ব্যাপারে সিদ্বান্ত নেয়ার জন্য

তিনি তার  আবেদনের কথা স্বীকার করে বলেন, সপ্তাহে তিন দিন এখানে হাজার  হাজার নারী পুরুষ আসার কারণে একদিকে যেমন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে, অপরদিকে আগে সিরিয়াল পাওয়ার জন্য অনেক নারীপুরুষ এমনকি মেয়েরা পর্যন্ত রাত ১২টা-১টায়ও চলে আসে। এতে অসামাজিক কার্যকলাপের আশঙ্কাও দেখা যাচ্ছে

মসজিদের দানের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতি দিন গড়ে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা মসজিদের নামে উঠলেও হাতে গোনা কয়েকটা মসজিদে সামান্য কিছু টাকা দেওয়া ছাড়া আর  কোন টাকাই দেয়া হয়নি। অথচ এখন পর্যন্ত মসজিদের নামে প্রায় কোটি টাকা উঠেছে। কোন মসজিদে কত টাকা দিয়েছে তিনি তা প্রকাশের দাবি জানান

স্থানীয় হলি চাইল্ড একাডেমীর ভাইস প্রিন্সিপাল শাহ জালাল  বলেন, গ্রামের মানুষের ব্যাপারে নাভিশ্বাস হয়ে উঠলেও ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না

তিনি বলেন, ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা আবেগের বশে এখানে আসেন। যারা আসছেন তারা সবাই শুনে আসছেন কিন্ত উপকৃত হয়ে আসছে, এমন লোক এখানে পাবেন না। তিনি অবিলম্বে গ্রাম থেকে এই ধরণের রোগী দেখা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমার স্কুলের বাচ্চারা ঠিক মত পানি খেতে পারছে না, বাথরুমে যেতে পারছে না

একই অভিযোগ করেন, এলাকার অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলী হায়দার, প্রবাসী খলিল, আবু বকরসহ নানা  পেশার মানুষ

আবু বকর জানালেন, আমি নিজেই ওষুধ খেয়েছি কোন  উপকার হয়নি। মসজিদের নামে টাকা উঠালেও মসজিদকে পুরো টাকা দেয়া হয় না

অভিযুক্তদের বক্তব্য: কবিরাজ শাহিনুর বেগমের শ্বশুর মাস্টার আবদুস সোবহান সব অভিযোগের ব্যাপারে বলেন, এখানে টাকা দেয়ার জন্য কোন চাপ দেয়া হয় না। আল্লাহর ওয়াস্তে কেউ দেয় আবার কেউ দেয় না। কত টাকা দৈনিক উঠে জানতে চাইলে তিনি প্রকৃত হিসাব না দিয়ে বলেন, সামান্য যে টাকা উঠে তা মসজিদগুলোতে সমান ভাগ করে দিয়ে দেই। তিনি একটি মসজিদ থেকে আসা দরখাস্ত দেখিয়ে বলেন, ভাবে প্রতিদিন টাকা চেয়ে দরখাস্ত আসে আমি তাতে টাকা দেই। পর্যন্ত প্রায় ১০-১২টি মসজিদ করেছি। 

ইউএনও, ওসি স্থানীয় চেয়ারম্যানের বক্তব্য:
নাঙ্গলকোট উপজেলার  নির্বাহী অফিসার সাইদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমার চিন্তায় আছে

নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রশান্ত পাল বলেন, বিষয়টি শুনে আমি চেয়ারম্যানকে বলেছি চেয়ারম্যান আমাকে জানিয়েছে, তাকে জনগণ বলছে তারা উপকার পাচ্ছে। তাই তাদের যেন ডির্স্টাব না করা হয়। জনগণ যদি উপকার পায় তাহলে আমরা এখানে কি করব। আমরা কিছু করতে গেলে মানুষ মনে করবে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কাজ করছে

নং বাঙ্গড্ডা ইউনিয়নের  চেয়ারম্যান মো. ইয়াকুব মজুমদার বলেছেন, বিষয়টি প্রশাসন থেকে আমাকে বলার পর আমি নিজে গিয়ে আগত লোকদের সাথে কথা বলেছি। তারা আমাকে জানিয়েছে, তারা এখান থেকে উপকার পাচ্ছে বিনিময়ে কোন টাকা পয়সা নিচ্ছেনা





লাকসাম মনোহরগঞ্জ নাঙ্গলকোটে ২৪ ঘণ্টার খবরের আপডেট পেতে আমাদের পেজটি লাইক করুন। পেজটি লাইক করতে এখানে ক্লিক করুন। আপনার একটি লাইকই আমাদের অনুপ্রেরণা। undefined